২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ - ০২:২৯
আইএসআইএলের সঙ্গে সম্পর্ক জেএমবির

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসআইএল'র সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে সম্পর্ক আছে।

আবনা : মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসআইএল'র সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে সম্পর্ক আছে। দুই সংগঠনের জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। জেএমবির কিছু সদস্য আইএসআইএল'র পক্ষ হয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য পাসপোর্টও তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তুরাগ থানাধীন ধউর আশুলিয়া ল্যান্ড পার্ক এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া ৭ জঙ্গি গোয়েন্দাদের জেরার মুখে এসব তথ্য দিয়েছে। জেরার মুখে জেএমবির জঙ্গিরা বলেছে, রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী লেখক ও সুফিবাদে বিশ্বাসী ধর্মীয় নেতাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি উচ্চ আদালত, সরকারি-বেসরকারি ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর ছকও তারা তৈরি করেছে।
ডিবির উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, জঙ্গি নকি ও নাহিদ প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যের বিভিন্ন এলাকায় সফরগুলোর খবর রাখত। নিরাপত্তা ভেদ করে কিভাবে হামলা করা যায় সে বিষয়ে একটি ছকও তৈরি করে। ওই ছকে সরকারপ্রধান ছাড়াও কয়েকজন মন্ত্রী এবং প্রগতিশীল চেতনার রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে। ডিবি সূত্র জানায়, কারাগারে যাতায়াত করে এমন দুজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তারা কারাবন্দি জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এ ক্ষেত্রে এবিটির স্লিপার সেলের সোহেল ও শামস নামে দুজনের নাম পাওয়া গেছে। এরা মুফতি রাহমানীর সঙ্গে কারাগারে দেখা করে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছে। এতে মুফতি রাহমানীর ঘনিষ্ঠজন হুমায়ুন অর্থায়ন করত। তাকেও খোঁজা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে দুর্বল হয়ে পড়ে মনোবল হারিয়ে ফেলা জেএমবি কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যও ছিল তাদের। ইতিপূর্বে জেএমবি সদস্যরা লেখক, বুদ্ধিজীবী, আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল।
গ্রেফতারকৃত জঙ্গিরা টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও হাইকোর্ট জামে মসজিদের খতিব নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার বিষয়ও জানে। তবে তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেনি। ২৭ আগস্ট ঢাকার রাজাবাজারের বাসায় ফারুকীকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তারা অপর জঙ্গি নেতা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিনকেও পুলিশি হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছে। গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার ভোররাতে জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমীর আবদুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদসহ (২৯) ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতার হওয়া অপর জঙ্গিরা হলেন- জেএমবির সদস্য মো. নাঈম আলী (২৮), সিকান্দার আলী ওরফে নকি (২৫), মাহমুদ ইবনে বাশার (২৩), মো. মাসুম বিল্লাহ (২৬), ফুয়াদ হাসান (১৮) ও আলী আহম্মদ (২৪)। এদের মধ্যে সিকান্দার আলী নকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও মাহমুদ ইবনে বাশার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
শুক্রবার ভোররাতে ডিবি (উত্তর) সহকারী কমিশনার মো. মিনহাজুল ইসলামের নেতৃত্বে এডিসি আবদুল আহাদের তত্ত্বাবধানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে ১০ কেজি জেলমিশ্রিত রাসায়নিক পদার্থ, অর্থ আদায়ের জন্য প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৪টি পিতলের মূর্তি, জঙ্গি তৎপরতা উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বেশ কিছু জিহাদি বই ও লিফলেট (প্রচারপত্র) উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের আরও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
ফারুকীর মামলার তদারকি কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, জেএমবির গ্রেফতার হওয়া ৭ নেতাকর্মী ফারুকী খুনের কথা স্বীকার করেনি। তারা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছে। তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ইরাক আর সিরিয়ার মধ্যেই এখন আইএসআইএল'র কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নেই। তারা বাংলাদেশেও তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশেও কাজ শুরু করেছে। ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে আইএসআইএল'র প্রতি কয়েকজন বাংলাদেশীর আনুগত্য প্রকাশের ভিডিও।
বাংলাদেশে আসার পথে কলকাতায় ৪ আইএসআইএল সমর্থক আটক হওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ওই খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে আইএসআইএল কর্মী সংগ্রহের কাজ করছে। যোগাযোগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে ভাইভার, স্কাইপ, ওয়াটস-আপ, টকএটোনসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সাইট। ফেসবুক, টুইটারেও এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
জেএমবির গ্রেফতার হওয়া আমীরসহ ৭ জঙ্গি আইএসআইএল'র সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা ২ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে কামাল আহমেদ সামা নামে জনৈক ব্যক্তির আপলোড করা একটি ভিডিও নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ওই ভিডিওর শিরোনাম ছিল- ‘খলিফা ইব্রাহিমের কাছে বায়াত (শপথ) গ্রহণ করছেন বাংলাদেশী মুসলমানরা।’ ইন্টারনেটে থাকা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাধারণ মেসগুলোর মতো একটি ঘরে পাঁচ তরুণ বা যুবক (মুখ কালো কাপড়ে পেঁচানো) নিজেদের আইএসআইএল'র প্রধান ‘আবু বকর আল বাগদাদি’র সমর্থক দাবি করছেন। তারা আরবিতে লেখা আইএসআইএল'র লোগোযুক্ত ব্যানার বহন করছে। আবু বকর আল বাগদাদি আইএসআইএল সমর্থকদের কাছে খলিফা ইব্রাহিম নামে পরিচিত। গ্রেফতার হওয়া সাত জঙ্গির সঙ্গে ওই ভিডিওর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা সেটিও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।
ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিরা স্বীকার করেছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রাজনৈতিক নেতাসহ ভিভিআইপি এবং ভিআইপি ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল, ‘এই হামলা করা হলে ঝিমিয়ে পড়া জেএমবি সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা হবে।’ মধ্যপ্রাচ্যে আইএসআইএল'র সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশেও তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা করে।
মনিরুল ইসলাম আরও জানান, আটক ৭ জনের বিরুদ্ধে তুরাগ থানায় দুটি মামলা হয়েছে। তাসনিম ওরফে নাহিদের বিরুদ্ধে এর আগে প্রায় ২০টির মতো মামলা রয়েছে। তিনি ১৭ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলারও আসামি। তার ভাই অপর জঙ্গি নেতা আবদুল্লাহ আল সোহাইল গাজীপুর আদালতে বোমা হামলা মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি।
জেএমবি সদস্যদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের তদারকি ও সমন্বয়কার কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম যুগান্তরকে জানান, গাজীপুরে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জঙ্গি নেতাকে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল নাহিদ। তারা ইরাকে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ নেয়ার চেষ্টা করে। সে লক্ষ্যে তারা কারাবন্দি একজন নেতাকে ছিনিয়ে নেয়ারও পরিকল্পনা করেছিল। বান্দরবন ও চট্টগ্রামে জঙ্গিদের ট্রেনিং সেন্টার ছিল। সেটি জানাজানি হওয়ায় এবং সেখানে পুলিশি অভিযানের কারণে তারা নতুন ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলারও পরিকল্পনা করেছিল। তারা নিয়মিত কুংফু-কারাতে ও বোমা এবং বিস্ফোরকের ওপর প্রশিক্ষণ দিত।
ডিবি সূত্র জানায়, কারাবন্দি আরেক জঙ্গি নেতা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিকে পুলিশি হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। চলতি বছরের ২৩ ফেব্র“য়ারি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ময়মনসিংহ আদালতে হাজিরা দিতে নেয়ার পথে ত্রিশাল থেকে জেএমবি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি ও রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ এবং যাবজ্জীবন সাজার আসামি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে ছিনিয়ে নেয় তারা। ছিনতাইয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টাঙ্গাইলে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাকিবুল নিহত হন। এখনও ধরা পড়েননি জঙ্গি সালাউদ্দিন ও জাহিদুল। মুফতি জসিমকেও একই স্টাইলে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল জেএমবির। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম, হিজবুত তাহরির বা হরকাতুল জিহাদের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর মোকাবেলা ও নিয়ন্ত্রণের মতো সক্ষমতা ও প্রস্তুতি পুলিশের রয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।